ইন্টারভিউ


কলকাতা নিয়ে এই কথোপকথনটা ছাপব না বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু এমন একটা ব্যাপার কলকাতাবাসীর কাছে বেমালুম চেপে যাব – পাপ হবে না ! তাই স্বর্গ থেকে প্রমিথিয়াসের কার্যত ঝেঁপে আনা আগুনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো সাজিয়ে ফেললাম – ইলেকট্রিসিটি আসার অপেক্ষা না করেই।

প্রশ্ন ১. কলকাতা কি ?
– শহর।
প্রশ্ন ২. আরে বাবা কলকাতা কি ? খায় না মাথায় দেয় ?
– ইতিহাসের পাতায় দেয়। এ শহরে যা ইতিহাসে আছে না, লিখতে বসলে দেখা যাবে যে, বইটা ছায়ার রেফারেন্স বুকের থেকেও মোটা হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন ৩. কলকাতায় কি আছে ?
– শিয়ালদা আছে, এসি মেট্রো আছে, খুচরোহীন অটো চালক আছে, ঘেমে যাওয়া একগুচ্ছ ভঙ্গুর বাস আছে, ট্রেন অবরোধ আছে, অল্প বর্ষায় জমা জল আছে, দগ্ধ নিউ মার্কেট আছে, এসপ্ল্যানেড আছে, ইডেন আছে, সৌরভ আছে, সৌরভ মানে বিপ্লব আছে, পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজি আছে, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের অকথ্য খিস্তি আছে, চায়ের ঠেক আছে, ঠেকে রাজনীতি আছে, সি.পি.এম আছে, তৃণমূল আছে, এদের দুজনের দিকে অভিযোগের তীর আছে, মিছিল আছে, ব্রিগেড আছে, ভিক্টোরিয়া আছে, চুমু আছে, নাটক আছে, শম্ভু মিত্র আছে, উৎপল দত্ত আছে, অ্যাকাডেমি আছে, ফুচকা আছে, নন্দন আছে, উত্তম আছে, সুচিত্রা আছে, সত্যজিত আছে, ঋত্বিক আছে, বিরক্তিকর দেব আছে, ডালহৌসি আছে, মহাকরণ আছে, স্বপ্ন আছে, কবিতা আছে, শ্রীজাত আছে, জয় আছে, জীবনানন্দ আছে, ছোট গল্প আছে, রবি ঠাকুর আছে, কলেজ স্কোয়ার আছে, কফি হাউস আছে, আড্ডা আছে, হাতে হাত আছে, চোখে চোখ আছে, প্রেম আছে…
প্রশ্ন ৪. প্রেম আছে ? কিভাবে ?
– ওই যে বলছিলাম হাতে হাত আছে ? চোখে চোখ আছে। তেমনই প্রেম আছে। কেমন প্রেম সেটা নিয়ে চর্চা হতেই পারে। যেমন ধর, সৌরভের সাথে ইডেনের প্রেম, গঙ্গার সাথে হাওড়া ব্রিজের প্রেম, শিয়ালদার সাথে বনগাঁর প্রেম, ইস্টবেঙ্গলের সাথে মোহন বাগানের প্রেম – ভেবে দেখ, এদের একজনকে ছাড়া আরেকজন কিন্তু অচল।

প্রশ্ন ৫. বুঝলাম। আচ্ছা, কলকাতার কি সব ভালো ? কিছুই খারাপ নেই ?
– তা কেন ? আছে। তবে কবি বলছেন, ‘এই দুনিয়ায় সকল ভাল।’ তাই কলকাতার গর্ত ভালো , ঘিঞ্জি ফুটপাথ ভালো, রাস্তার ধারের চাউমিন ভালো, ঘেমো গরম  ভালো, প্রবল চিনি গোলা লস্যি ভালো, নাবালক-প্রেম ভালো, ধরা পড়ে যাওয়া প্রেমপত্র ভালো, রক্ত ভালো, রক্তক্ষরণ ভালো, আঠারো বছর বয়স ভালো, বৃষ্টি ভিজে হাঁচি ভালো, অষ্টাদশীর খোলা চুল ভালো, ফর্সা গালে টোল ভালো, শীতকালে ল্যাদ ভালো, ট্রাফিকে প্যানপ্যানে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভালো, বাংলা গান ভালো, বাংলা বনধ্‌ ভালো, ভারত বনধ্‌ আরও ভালো, কলেজ কাটা ভালো, প্রকাশ্যে আদর ভালো, উড়তে চাওয়ার স্বপ্ন ভালো, বেকার ছেলের কবিতা ভালো, কমবয়সে সিগারেট ভালো, কিন্তু সবার চাইতে ভালো নতুন জামা আর পুজোর শপিং।

প্রশ্ন ৬ : পুজোর শপিং ? হ্যাঁ শুনেছি কলকাতায় নাকি পুজো টুজো কি একটা হয় – তিন চার দিন ধরে ? ব্যাপারটা কি একটু বলুন তো !
– হ্যাঁ বলছি। আসলে এই যে পুজো এ হল আপনার জীবনের যাকে বলে খুশির চারটে দিন। এখন দেখছি তিনদিন হয়ে গেছে। সুখ আর সইল না বুঝলেন কপালে। যাই হোক খুশি বলতে যেটা বলছিলাম – ছোটদের শাসন নেই, বড়দের বাঁধন নেই। শুধু আছে ছুটি, প্রেম, মণ্ডপ, প্রতিমা, দেদার লাইন, আইসক্রিম, এগরোল, নতুন শার্ট, গরীব মানুষ, খেতে না পাওয়া মানুষ, উলঙ্গ মানুষ, হাড় সর্বস্ব মানুষ, খিদেয় কুঁকড়ে যাওয়া মানুষ, রাস্তার কুকুর, বলে রাখা ভালো পুজোর দিনে কোন মাঝরাত নেই সন্ধ্যে নেই বিকেল নেই। শুধু একরাশ আলো আছে, টুনি আছে, টুনির মা-ও আছেন আরও কত কি ! বলে শেষ করা যাবে নাকি !

প্রশ্ন ৭: আচ্ছা আপনি কিছুক্ষণ আগে বনধ্‌-এর কথা বলছিলেন। বনধ্‌ কি ? কেন হয় ?
– বনধ কেন হয় ? এ নিয়ে কলকাতার কোনদিন মাথাব্যথা ছিল না, থাকবেও না। কলকাতার বনধ্‌ মানে আমার-আপনার বনধ্‌। কলকাতার কাছে বনধ্‌ মানে দেরি করে ঘুম ভাঙা, ড্যাম্প পড়া ঘর, ছোট গল্প, সোফা,  সিলিং ফ্যান, কচুরি, সুনশান রাস্তাঘাট , দুপুরে মাংস, ফের ল্যাদ, বিকেলে ফাঁকা গলিতে প্রেম,  পড়ুয়াদের প্রাইভেটে অলিখিত ছুটি,  সারা সন্ধ্যে রাগ-দুঃখ-আনন্দ-যৌনতা মেশানো স্টার জলসার সিরিয়াল, রাতের খাবার, পরের দিনের বনগাঁ লোকালের ঘেমো চিন্তা, ফের বিছানা, ফের ঘুম।

প্রশ্ন ৮: আচ্ছা কলকাতার কি ইমোশান আছে ??
– সেকি মশাই ? কলকাতার প্রেম আছে আর ইমোশান নেই। কলকাতা একটা জলজ্যান্ত প্রাণ। এর মাথা আছে, চোখ আছে, বুক আছে, ক্লিভেজ সব সব আছে। কিন্তু মুশকিলটা হল বোঝার লোক নেই। কলকাতার অরগ্যাজমকে ফিল করার লোক নেই।

প্রশ্ন ৯ : আপনি দেখছি মাঝেমাঝে খুব সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছেন। এর কি কারণ ?
– এর কোনও বিশেষ কারণ নেই জানেন তো। আসলে বাঙালি দুমদাম কলকাতাকে বদলাতে চায়। কিন্তু কলকাতাকে কি বদলালে ভালো লাগবে ? এই ফুটপাথ, ফুচকা, নতুন বইয়ের গন্ধ, রাস্তায় ফেলা থুতু, ধর্মতলার ক্যাকোফনি, শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়, ভিক্টোরিয়ার বাদাম, নন্দন চত্বর, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, হারমোনিয়াম, পাঞ্জাবী, ধুতির কোঁচা, গড়ের মাঠ, বৃষ্টিধোয়া জল, গরমে সিলিং ফ্যানের সাথে হাত পাখা, খবরের কাগজ, হাঁটু অব্দি গোটানো জিন্স, আস্তিন গোটানো বোতাম খোলা জামা, বিয়ে, রসগোল্লা, বিরিয়ানি, ধোসা, বিয়ের পর পরকিয়া অতঃপর ভুঁড়ি, গ্যাস-অম্বল-চোঁয়া ঢেঁকুর, জেলুসিল আর এল.আই.সি ছাড়া বাঙালি সিম্পলি বাঁচবে না। জাস্ট মরে যাবে।

প্রশ্ন ১০ : তাহলে কি বলতে চাইছেন ? বাঙালি বাঁচবে না ? এতোবড় জাতিটা বেমালুম লোপ পেয়ে যাবে ?
– দেখুন, আমি কিছুই বলছি না। বলবে সময়। তবে কি জানেন তো, কে বেশ যেন একটু কাব্যি করে বলেছিল, “একদিন আমেরিকাও ধ্বংস হবে / বিলেত যাবে ঝুলে, / শুধু ‘জয়-বাঙালি’ থাকবে টিঁকে ভাতে-ইসবগুলে।”
কলকাতা হেঁটে চলুক নিজের মত। আমরাও হেঁটে চলছি তাঁর শরীর বেয়ে। কবিকে ধার করেই বলি, “এ কলকাতার ভেতর আছে আরেকটা কলকাতা…” হেঁটে-দৌড়ে-বসে-শুয়ে নয়, ভালোবেসে দেখতে শিখুন।

এই বলেই জোব চার্নকের ভূত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। হ্যাঁ কথাটা জোব, অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিতরা জব বলে।

উৎসর্গ : সেই সমস্ত ছেলে এবং মেয়েরা যারা কলকাতাকে ময়লা-নোংরা শহর বলে চেনে, যারা কলকাতাকে ক্যালিফোর্নিয়া হিসেবে দেখতে চায়।

ঋণ : হৃদয়হরণ এবং অনিমেষ। যারা সেদিন প্রায় ভোর হতে যাওয়া মধ্যরাতে আমার সাথে প্ল্যানচেটে বসেছিল।

Advertisements

4 Comments Add yours

  1. sohomsays says:

    হীনমন্যতায় ভোগা সেই সব বাঙালি যারা কারণে অকারণে উদারীকরণের জয়ধ্বনি দিয়ে, পাশ্চাত্যপ্রেম প্রকাশ করে এই শহর টাকে গালাগালি করে, তাদের উদ্দেশ্যে সপাটে কড়া পাঁচের থাপ্পড়। এবং আমার অন্যতম প্রিয় লেখাগুলোর একটি।

    Liked by 1 person

  2. arindamm10 says:

    ফাটাফাটি । 😍😍😍😍

    Liked by 1 person

  3. Arjun Das says:

    কলকাতাকে কলকাতার মতো করে দেখতে চাওয়া মানুষ কমে যাচ্ছে কথক!

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s