বসন্তের প্রতীক

বছরখানেক আগে কলকাতায় গিয়েছিলাম। ভীষণ গরম ওখানে। বাবা গ্রান্ড হোটেলে কাজ করতেন। বাহাদুর উপাধিও জুটেছিল তার নামের পিছনে। বাবা মারা যাবার আগে কখনও অভাব কাকে বলে ফিল করিনি। বি.এ. পাস করেছি। ইতিহাসে। এখানে পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ানোর সুযোগও জুটে গিয়েছিল।মাইনে যদিও কম। তবু আমার আর মা’র দিব্যি চলে যেত। বিলাসিতা বলতে আমার কেবল ছিল লেখালেখি। হঠাত, মা’র শরীর খারাপ হল। প্রথমে জ্বর। তারপর রক্তবমি। ডাক্তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা চলে গেলেন। সারা শহরে একা হয়ে পড়লাম আমি। একাকীত্বের ফলে মানসিকভাবে দুর্বল লাগত নিজেকে। কিছু পয়সা জমিয়ে, মাস দুয়েক পর, চাকরিটা ছেড়ে দিলাম, একা একা আর কাঁহাতক ভালো লাগে। চলে এলাম কলকাতায়। লিখব বলে। মা’র চলে যাবার পরে এটাকেই প্রফেশন করব ভেবেছিলাম। কলকাতা বিরাট শহর। বিরাট। আমাদের শীতপ্রধান শহরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কোলাহল, কলরব আর উষ্ণতা এখানে। কিছু না কিছু তো জুটে যাবেই, এই ভেবেই বাক্স-প্যাটরা নিয়ে চলে আসা। রিপন ষ্ট্রীটের ঘিঞ্জি মেসের মধ্যে একটা মেস পেয়ে গেলাম। একটা ছোট ঘর। জায়গায় জায়গায় ফেড হয়ে গেছে, দেয়ালে করা চুনকামের নীল রঙ। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। রাতে ঘুমোতে ভয় হয়। দরজার অবস্থাও শোচনীয়। আলতো ধাক্কাতেই কলকব্জা খুলে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে এমন। একটা জীর্ণ খাট আছে,  শুতে ভরসা হয়না। আমি খাটে নয়, অভ্যেসবশত  মেঝেতেই শুতাম।

মাস দুয়েক চলল এভাবেই। কাউকে চিনিনা। এক্কেবারে একলা শহরে মাথা গোঁজার ঠাই তো হল ঠিকই, কিন্তু খাবার ? পুঁজি প্রায় শেষের পথে। এভাবে চললে আর বড়জোর একমাস। এসেছিলাম লেখক হতে, হয়ে গেলাম নামকরা পুঁজিপতি খাবার দোকানের এক সাধারণ কর্মচারী। উত্তরবঙ্গের চেহারা,  সবাই আদর করে বাহাদুরদা বলেই ডাকত – আমার বাবার কথা মনে পড়ত। দিলীপ মুখার্জী নামের ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল, এই দোকানেই। নিজের বাচ্চা ছেলেটির জন্মদিনের কেক নিতে এসেছিলেন। পেশায় লেখক শুনে সেধে পরিচয় করি। কথাবার্তায় সেদিন যা বুঝেছিলাম, তিনি মানুষ ভালো। লেখালেখির প্রতি আমার আগ্রহ দেখে আমাকে একদিন তার বাড়িতে যাবার কথাও বললেন। এতদিনের লেখালেখি গুলো দেখবেন বলে কথাও দিলেন।

সপ্তাহখানেক কেটে গেল। ছোটবেলায় মা শিখিয়েছিলেন, অচেনা মানুষের বাড়ি দুম করে চলে যাওয়া যায়না – এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। একদিন ফের দিলিপ বাবু দোকানে এলেন, সাথে তার ছেলে। তিনি বারবার ঘুরেঘুরে দেখছিলেন আমায়। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলাম। দোকানের ম্যানেজারকে বললাম, “ওই টেবিলে আমায় পাঠাবেন না স্যর। সমস্যা আছে”। সত্যি বলতে ভীষণ লজ্জা করছিল। আমি অন্য টেবিলে কাজ করছি এমন সময় আমার জামার কোঁচা ধরে টান দিল কে একটা ? মুখ ফিরিয়ে দেখি একটা বছর দশেকের ছেলে – দিলিপ বাবুর ছেলে। বলল, “বাবা ডাকছেন”। আর এড়ানো যায়না। জিজ্ঞেস করলেন আসিনি কেন? সত্যিটা বললাম। বললেন, “একদিন ফোন করে চলে এসো”। আমি মাথা নাড়লাম। -“ও শোন, হাতে নয়, লেখা গুলো পারলে টাইপ করে বা প্রিন্ট করে নিয়ে এসো। এখন হাতে লেখার জমানা চলে গেছে। কোথাও ছাপতে দিলে হাতের লেখা পড়তে চায়না”।  টাইপ শিখেছিলাম স্পিড ৪৫, খুব বেশি নয়, তবু চলে যাবে। সাইবার ক্যাফের ভেতর ঘাড় গুঁজে বসে লেখাগুলোকে নতুন ভাবে টাইপ করলাম। এখানে প্রিন্ট করার খরচ আমাদের শহরের থেকে কত কম। এবার যাবই। আমি তৈরি হলাম।

এক বুধবারের মেঘ কেটে যাওয়া বিকেলে তার বাড়ি গিয়েছিলাম লেখাগুলো নিয়ে। আমার লেখাগুলো খুব করে খুঁটিয়ে পড়লেন তিনি। বললেন, “এগুলো রেখে যাও। আমি এগুলো আমার পরিচিত কয়েকজনকে দেখাব। তোমার লেখাগুলো আমার ভালো লেগেছে। সত্যি বলতে খুব শক্তিশালী লেখা। ধর্ম নিয়ে বহুদিন বাদে এমন শক্তিশালী লেখা পড়লাম। লেখাটা ছেড়োনা। আমি দেখছি,  তোমার জন্য কি করা যায়।” দিলীপ বাবুর স্ত্রী বাড়িতে নেই। নিজের হাতে তৈরি চা আর শিঙাড়া খাইয়েছিলেন। অমৃতসম তার টেস্ট আর পাহাড়প্রমাণ তার সাইজ। লোকটার প্রতি কৃতজ্ঞতায় যেন সারা শরীর আমার নুইয়ে আসছিল। দারুণ একটা পজিটিভ মন নিয়ে বেরিয়ে এসছিলাম। অন্ধকার রাস্তায় তারার আলো দেখে পা ফেলতে ফেলতে কত স্বপ্ন বুনেছিলাম সেদিন তার ইয়ত্তা নেই। অনেক বড় লেখক হব, অনেক বড়। আমার প্রথম বই বেরোবে, প্রথম উপন্যাস। মা’কে উৎসর্গ করব। উফফফফ। কলেজ স্ট্রিটে রবিন গুরুং বলতে সকলেই চিনবে। স্বপ্নের ক্লান্তিতেই আমার ঘুম এসে গিয়েছিল।

সেদিনের পর প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল দিলীপ বাবুর তরফ থেকে কোনরকম খবর আসেনি। আমি রোজ তার জন্য অপেক্ষা করি। ম্যানেজারকে রোজ জিজ্ঞেস করি, তিনি এসেছেন কিনা বা কোন খবর পাঠিয়েছেন কিনা। প্রথম প্রথম ভালো ভাবেই জবাব আসত, “না আসেনি”। এখন এ প্রশ্ন করলেই, ম্যানেজার তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। স্বাভাবিক। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। লেখাগুলো হয়ত কারোর পছন্দ হয় নি। হয়ত, দিলিপ বাবু এখনও চেষ্টা করে চলেছেন।  একদিন দোকানে পুলিশ এলো সন্ধেবেলা। আমায় ধরে নিয়ে গেল। পুলিশ ভ্যানে বসে অগুনতি বার জিজ্ঞেস করলাম আমায় কেন নিয়ে যাচ্ছেন ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? আমার অপরাধটা কি ? কোন কিছুর কোন উত্তর দিল না কেউ। এক অন্ধকার গলিতে এনে ফেলল ওরা আমাকে। চারদিকে নোংরা আবর্জনার স্তুপ। স্তুপের কাছে উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটা দেহ। এক কনস্টেবল আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো দেহটার কাছে। দেহের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা কয়েকটা কাগজ। কাছে যেতে দেখলাম সেগুলো আমারই টাইপ করে দেওয়া কাগজগুলো। বুকটা ছ্যাত করে উঠল। এক কনস্টেবল এগিয়ে এসে বডিটাকে সামনে উলটে দিল। সরাসরি দেখতে পাচ্ছি লোকটার মুখ। আমি কদিন আগেই যার বাড়িতে আমার লেখাগুলো দিয়ে এসছিলাম। দিলীপ বাবু। পেটে ছুরির দাগ। সাদা জামায় রক্ত লেগে আছে। একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে এপাশে। সাথে বাচ্চা। বাচ্চাটিকে আমি চিনি। এবং মহিলাটা কে সেটা বুঝতে বিন্দুমাত্র বাকি রইল না আমার। বাচ্চাটি বার দুয়েক বলল, “ এই কাকুটাই বাবাকে এই কাগজ গুলো দিয়েছিল”। মাথায় বিদ্যুতের মত খেলে গেল যে আমার লেখাগুলোই ওর মৃত্যুর কারণ বা বলা উচিত আমার ধর্মকেন্দ্রিক লেখাগুলোই ওনার মৃত্যুর কারণ। চোখ কান বুজে, ওগুলো যে আমার লেখা, অস্বীকার করলাম সরাসরি। বাচ্চাটির কথার ভিত্তিতে ওরা আমাকে ধরে এনেছে। বললাম, “নানা আমি দোকানের সাধারণ কর্মচারী। আমি এসব কি লিখব। আমায় অন্য এক যায়গায় ভালো মাইনের চাকরি দেবেন বলে, ওনার বাড়িতে ডেকেছিলেন। কথায় কথায় উনি আমায় কাগজগুলি দেখিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্বাস করুন স্যার আমি কিচ্ছু করিনি”। নাবালক শিশুর কথা পুলিশ মেনে নিলনা, আমায় ছেড়ে দিল। ছেলেটির কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমার কিচ্ছু করার ছিল না সেদিন। ওদের গাড়িতে যখন উঠছিলাম, দেখলাম বাচ্চাটি তার বাবার মৃতদেহের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হাঁটুগেড়ে বসে সে কি একটা তুলে নিল। কাগজ ?
পরে শুনেছিলাম দিলীপ বাবু প্রথমে প্রায় দু সপ্তাহ নিখোঁজ ছিলেন তারপর তার রক্তাক্ত দেহ খুঁজে পায় পুলিশ সাথে আমার টাইপ করা কাগজগুলো। আর ছ’মাস ছিলাম তোমাদের শহরে। তার আগেই চলে আসতাম কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থাকতেই হয়েছিল। কিন্তু ভারতে মৌলবাদীদের কোন শাস্তি হয়না – এবারও ব্যতিক্রম নয়। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়েছিল। এখনও হয়। যদি ওরা জানতে পারে আমিই সেগুলো লিখেছিলাম, তাহলে হয়ত আমাকেও… তাই সেদিন রিপনষ্ট্রীটের মেসের ভেতর পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, আমার হাতে লেখা বাকি কাগজগুলো। সমস্ত প্রমাণ লোপাট করে ফিরে এলাম দার্জিলিং এ। এখন লেখালেখিটা একদম ছেড়ে দিয়েছি। স্কুল টিউশানির বয়স নেই। এই ষ্টেশনারী গুডস্‌-এর দোকান দিয়েছি। বেশ চলে যাচ্ছে।

গল্প শেষ করে চায়ের পেয়ালাটা প্লেটের ওপর রাখল রবিন গুরুং। ঠুং শব্দ দিয়ে গল্পে দারুণ একটা মাত্রা এনে দিয়ে গুরুং দা বলতে লাগল, “ওই পৃষ্ঠা গুলোতে লিখেছিলাম কি জান ?” আমরা হাঁ করে চেয়ে আছি ওঁর দিকে। গুরুং দা বলতে লাগল, “এক্স্যাক্ট তো মনে নেই, প্যারাফ্রেজ করেই বলছি, যে ধর্মে একটাও মৃত্যু হয়েছে, সে ধর্ম মানুষের জন্য নয়। সে ধর্মের প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলতে হবে। দরকারে অস্ত্র নিয়ে।” এই কথা লেখার জন্য একটা লোককে খুন হতে হল, ভাবা যায় ? সাধারণ কথাটুকু বলার অধিকারও নেই এ দেশে ? দীর্ঘশ্বাস ফেলে  গুরুং দা চলে গেল দোকানের কাস্টমারের সাথে কথা বলতে। আমি আর সৌম্য দা মুখ চাওয়া-চায়ি করছি। ত্রিদেব উঠে একটা সিগারেট ধরাল। সৌমন দা, নিজের হাতে হাত ঘষে চলেছে ক্রমাগত। পাহাড়ের কোলে সন্ধে নামে দ্রুত আর রাত আরও তাড়াতাড়ি। উপত্যকার যে অংশ চুইয়ে পড়েছিল সূর্যের গোধূলি আলো, সেই অংশে এখন তীব্র অন্ধকার। অযাচিত ব্ল্যাকহোল যেন। দার্জিলিং এর ম্যালে কানঢাকা টুপি পরে দৌড়চ্ছে কয়েকটা একরত্তি বাচ্চা। নাকটা বোঁচা, চোখটা ছোট কিন্তু ভীষণ মিষ্টি। আকাশের গায়ে মিটিমিটি তারা জ্বলছে। কুয়াশা নেমে আসছে ম্যালে। নীচে এখন বসন্তের আমেজ। দোল কেটেছে সাময়িক। পারদ মিটার বাড়ছে অবলীলায়। আমগাছে ছোট ছোট ফল হয়েছে। তবে পলাশ-কৃষ্ণচুড়ার দল এবার হেরে গেল। গোহারা। বরং আউট অফ নো হোয়ার, ধর্ম এসে  মৃত্যু আর রক্তকে বসন্তের প্রতীক করে দিয়ে চলে গেল। ধিক্কার ধর্ম।

পুনশ্চ : গুরুং দাকে আমরা আগে চিনতাম না কিন্তু সেদিন ধর্মান্ধতা নিয়ে আমাদের আলোচনা শুনেই, আমাদের বিশ্বাস করে বলেছে সে এই কথাগুলো বলেছিল। বারণ করে ছিল কাউকে জানাতে। আমরা কসমও খেয়েছিলাম এ কথা কারো পেট থেকে কোথাও, কখনও বেরোবে না। ধর্মের জন্য এই অর্ধমৃত পৃথিবী আর সাম্রপদায়িক সাম্রাজ্যলোভ যেদিকে এগিয়ে চলছে, তাতে অচিরেই এই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে – গুরুং দার এই কথা তাই সবাইকে জানানো উচিত- সব্বার জানাও উচিত। ক্ষমা করো গুরুং দা, তোমার কথা ওঁরা আমায় রাখতে দেয়নি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s