রবীন্দ্রনাথ এবং স্বাধীনতা (বিষয় : তাসের দেশ)

“তাসের দেশ” গীতিনাট্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে। মাঘ মাসের রচনা। উৎসর্গ করেছেন নেতাজি-কে। যিনি তৎকালীন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতা। তাসের দেশ নাটকটির মূল ভাব যদি একলাইনে বলতে হয়, তাহলে একটাই কথা আসে সেটা হল নূতনের উপাসনা। রবীন্দ্রনাথ প্রাথমিকভাবে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতাকে সমর্থন করেছিলেন; তিনি তা স্বীকারও করেছেন ‘সভ্যতার সংকট’ নিবন্ধে। ভারতের মত বিশাল ভূখণ্ডে যে আধুনিকতার প্রয়োজন ছিল, তা ঘটাতে গেলে প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের ফিউশন দরকার। কিন্তু ইংরেজরা তা করেননি। ভারতের ধনসম্পত্তি লুট এবং ভারতের মত সেকুলার দেশে, হিন্দু-মুসলিমের অঘোষিত ক্রুসেড বাধিয়ে দিয়েছিল তারাই। যাইহোক, মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক, তাসের দেশ নাটকটির মরাল কেবলমাত্র নতুনকে গ্রহণ করা নয়, স্বাধীনতাও। সেই স্বাধীনতা কিন্তু একমাত্র পুরুষের পেশীশক্তির উদযাপন-এমনটা নয়, তা নারী মননের স্বাধীনতাও। ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সফলতার জন্য এক সামগ্রিক বিদ্রোহের দরকার ছিল, সেই যায়গায় ইতিউতি গজিয়ে ওঠা বিপ্লব বা আন্দোলন যে কোনভাবেই ইংরেজ শাসকদের বিব্রত করবে না, তা রবীন্দ্রনাথ বুঝেতে পেরেছিলেন। আর তিনি যে সামগ্রিক বিদ্রোহের কথা বলেছেন, তাতে কোন রকম লিঙ্গভেদ ছিলনা। তাসের দেশ নাটকটি শুরু হচ্ছে, খরবায়ু বয় বেগে গান-খানি দিয়ে। তার একটি লাইনে কবি লিখেছেন, “তুমি কষে ধরো হাল, / আমি তুলে বাঁধি পাল”- বোঝাই যাচ্ছে যে তিনি ছুটকো-ছাটকা বিপ্লবের ধারপাশ পর্যন্ত মাড়াচ্ছেন না। গানটায় প্রকৃতির যে ঝঞ্ঝাপূর্ণ সময়ের কথা বলা হয়েছে, তাকে যদি ভারতের সেই সময়ের সমাজ ধরে নি, তাহলে সেই সমাজের সাথে তাল তাল মিলিয়ে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ ভুলে সবাইকে লড়াই করতে তিনি বলছেন এবং সে লড়াই অবশ্যই সমাজে থেকে, সিস্টেমের মাধ্যমে সিস্টেম ভাঙার লড়াই।

মূল গল্পের শুরুটা হল দুই বন্ধুর বচসাকে কেন্দ্র করে। রাজপুত্র এবং সদাগরের এই দ্বন্দ্বের বিষয় ছিল আবদ্ধতা বনাম মুক্তির আনন্দ। যৌবনের একঘেয়েমি রাজপুত্রের আর পোষাচ্ছে না, তাই সে বেরিয়ে পড়তে চাইছে অন্য কোথাও। রাজপুত্র নবীনাকে খুঁজতে চান। রবীন্দ্রনাথ চূড়ান্ত সিম্বলিক। তাই নবীনা অবশ্যই কোন মেয়ে নয়, জীবনানন্দের সুচেতনার মতই সে এক ভাবনা। এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা নেই – অ্যাবস্ট্রাক্ট যাকে বলে আরকি। চির-আবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে রাজপুত্র আর সদাগর এই নবীনাকে খুঁজতে গিয়ে এসে পড়ে সমুদ্রের অন্য পাড়ে। যে দেশে নতুনকে পাবার আশায় তারা এসেছিল, সেখানে আবার আরেক ফ্যাচাং। সেখানে নিয়মের যে শিকল রয়েছে, তা ক্যাথলিক চার্চের দাবীগুলির চেয়েও ভয়ংকর। পরাধীনতার বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া ভারতের কোন ক্লোন রাস্ট্র যেন তৈরি করেছেন রবীন্দ্রনাথ। দেশের নাম তাসের দেশ। তাসের খেলায় যেমন প্রতিটি তাসের নিজ এক্তিয়ারের বাইরে যেতে পারেনা, তেমনি হয়েছে ভারতবাসীর দশা। দশ বছরের মেয়ের খেলার পুতুল যেন, যেমন চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, তেমনি আঁচড়াতে হচ্ছে।

ফ্যাসিজমের চরম সফল রূপ হচ্ছে এই দেশ। এক অদ্ভুত মিলিটারি শাসন যেন। রাজপুত্র বলছে যে, এই নিয়ম হল চাপানো, আর অনিয়মকে এদের রক্তে প্রবেশ তারাই করাবে। ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের মত তাসের দেশের জনগণ শুধু খাটে, রাষ্ট্রের কথা শোনে, পালটা কথা বলেনা। সেই মধ্যবিত্ত সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিতে হবে, খুব শিগগিরি। ছক্কা বলে ওঠে, “শুনলে তো রাজাসাহেব, কথাটা তো শুনলে? লোকটা এগোতে চায়, বললে বিশ্বাস করবে না, লোকটা হাসে। দুদিনে এখানকার হাওয়া দেবে হালকা করে।” – কি অতিমানবিক স্যাটায়ার রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করছেন এখানে। ফ্যাসিস্ট শক্তি যে বাতাসকে আটকে রেখেছে, রাজপুত্র উৎপাতের মাধ্যমে আনতে চেয়েছেন সেই বাতাস। অনিয়মের নিয়মই যেন, নিয়ম ভাঙার উপায়। ফ্যাসিস্ট নেতারা জানেন বা বলা ভাল প্রত্যেক শাসকই জানেন, অনিয়ম ছোঁয়াচে। হালকা আঘাতে নিয়মের বাস্তিল গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

কিন্তু সেই অনিয়মের সংক্রমণের জন্য কাউকে তো সে রোগ ধরাতে হবে। রবীন্দ্রনাথ এখানেই বোধহয় নাটকের সবথেকে বড় সত্যটি তুলে ধরেছেন।  ভারতের সবথেকে অবহেলিত মানুষ যে নিম্নবিত্তরা নয় বরং নারী; একমাত্র সেই নারীই পারে এই সংক্রমণের অনুঘটক হতে। রাজপুত্র তাই অন্য কাউকে নয়, রাণীবিবির মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন প্রেম। যুদ্ধবাজদের কাছে যা ব্রক্ষ্মাস্ত্র; ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে হাতে হাত রেখে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবার প্রেরণা।

নারীরা আসলে অবদমিত হতেই চেয়েছে। সমাজের জাঁতাকলে পড়ে নিজেদের কথা ঠিক কিভাবে পেশ করতে হবে তাদের অনেকেই এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। হ্যাঁ, এখনও পারেনি। যেহেতু এতদিন সমাজ ছিল পুরুষশাসিত, তাই এখন পুরুষরা অবদমিত হোক, এমনটাই অনেকের মত। আবার এমনটা অনেকের সরাসরি মত নয়, তবে ভেতরে ভেতরে তারাও হয়ত এটাই চেয়েছে। কিন্তু সেও এক প্যাট্রিয়ার্কি। তবে রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রে অন্দরমহলেই বুড়িয়ে যাওয়া নারীকে খোলা মাঠে এনে নাচিয়ে গাইয়ে একদম আরেকটি ছেলের সাথে মিলিয়ে দিচ্ছেন, নাটকে এটা বোধহয় চূড়ান্ত প্রতীকী বলে চোখ এড়িয়ে যায়।

নেতাজির এক নারীবাহিনী ছিল। ঝাঁসির রাণী বাহিনী বোধহয় তার নাম। নাটকের নারী চরিত্রেরা যেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়ে যাওয়া সেই নারীদের কাব্যিক প্রতিনিধি। যারা নিজেদের সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংসারিক বাঁধনকে তুচ্ছ করে, একটা মিথ্যে কনভেনশনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। শুধু রুখে দাঁড়াচ্ছে তাই নয়, নাটকের একদম শেষে তারা সেই অনিয়মের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে পুরুষ মননেও। এখানেই রবীন্দ্রনাথ পুরুষ বিদ্বেষী বা নারীবাদী নন। তিনি খুব ভাল করেই জানেন, বায়োলজিকালি মেয়েরা তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে পুরুষের থেকে। ফলে মানুষ হিসেবে যে লড়াই তাতে দুজনকেই অংশগ্রহণ করতে হবে। পরিপূরক হতে হবে একে অপরের। যাইহোক, নাটকের ফ্যাসিস্ট রাজাও প্রাণ খুঁজে পাচ্ছে বেনিয়মের মধ্যে। সেও চাইছে নিয়ম থেকে ছুটি। রবি ঠাকুরের নিয়ম ভাঙার মধ্যে এক অদ্ভুত বিনয় ছিল। তিনি নিয়মের সবথেকে বড় যে রক্ষক তাকে নিয়ে নিয়ম ভাঙতে যেতেন। বিরোধী পক্ষের ধ্বংস নয়, তাকে যুদ্ধের শরিক করে নেওয়ার এক অদ্ভুত চেষ্টা তিনি করে গিয়েছেন। যেমন রক্তকরবীতে ছিলেন রাজা, তেমনি এ নাটকে তাস দেশের রাজা। দুটি নাটকেই অদ্ভুত ভাবে রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহের মশাল দিয়েছেন কোন এক নারীর হাতে। ভারতের প্রতিটি গৃহনিপুণা মেয়েকে একদম রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেটা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কতটা বাস্তবতা পেয়েছে আর কতটা কাব্যিক রয়ে গেছে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলতে পারে। এখনও ধর্ম এবং জাতির ভিত্তিতে নারীরা চরম অবহেলিত। পশ্চিমবঙ্গে চিত্রটা অন্যরকম হলেও, রাজস্থান বা বিহারে ছবিটা চোখে দেখা যায় না। কদিন আগেও ফেসবুকে একটা ছবি দেখেছি, যেখানে একজন অন্তঃসত্ত্বা মাথায় ইঁট বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অতএব, হিউম্যান রেসের একটা অংশ লড়াই করছে এখনও নিজেদের স্বাতন্ত্রের লড়াই। ন্যাকা ন্যাকা প্রেমের উপন্যাস বাদেও স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার উত্তরকালে ঘটে চলা এই তীব্র স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা যে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, সেটা আশাকরি বোঝা যাচ্ছে। যে ভাঙার গান তিনি নাটকটির একদম শেষে লিখেছেন, তা থেকে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার, যে পুরাতন জীর্ণ এবং সমসাময়িক নয়, তা ফেলে দিতে হবে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই লাইনটির যে অপব্যাখ্যা হচ্ছে। পুরাতন এবং জীর্ণ পুরাতনের মধ্যের তফাত লোকে দেখছে না।

নাটকের শেষে যখন তাসের দেশের রাণী নিজের মানুষ হয়ে ওঠা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তখন রাজপুত্র তাকে অভয় দিচ্ছেন। এই হাতে হাত রেখে তীব্র লড়াইটাই ভারতের মানচিত্র থেকে বেমালুম লোপাট হয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্র শোষণ আর উপনিবেশিক শোষণ সংজ্ঞাগত দিক থেকে আলাদা হলেও, ব্যাপারটা খুব একটা আলাদা নয়। স্বাধীনতা আমরাও খুঁজছি। সামাজিক গন্ডি থেকে, পারিবারিক গন্ডি থেকে এবং রাষ্ট্রের গন্ডি থেকেও।   রবীন্দ্রনাথ রাজপুত্র হয়ে এসেছেন সে হাওয়া বদলে দিতে কিন্তু সমস্যা হল, এই ফ্যাসিজমের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি ভীষণরকম সংখ্যালঘু। নিয়মের সংখ্যা যেখানে বেশি, সেখানে বেনিয়মী চাই আরও বেশি। জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্র সেই বেনিয়মের অ্যান্টিডোট হিসেবে ব্যবহার করছে। আমাদের সবাইকে সেই যায়গায় হাতে হাত রেখে লড়াই করতে হবে – উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যলোভ আর ধর্মীয় মেরুকরণের সূক্ষ্ম রাজনীতির উলটো মতবাদ তৈরি করতে হবে। করতে হবে আন্দোলন। প্রয়োজনে মৌলবাদের বিরুদ্ধে ধরতে হবে অস্ত্র।

– “মুক্ত হও, শুদ্ধ হও, পূর্ণ হও”
দহন দরকার। প্রবলভাবে দরকার। মুক্তির জন্য। শুদ্ধির জন্য। পূর্ণতার জন্য। দেশ নয় সারা পৃথিবীর বুকে। যে দহনের দহনাংশ থেকে উঠে আসবে নতুন সভ্যতা।নতুন নিয়ম। বেনিয়মের নিয়ম। হেরে গিয়ে জিতে যাওয়ার নিয়ম। একমাত্র সেদিন “তাসের দেশ” তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। ততদিন সেই আসন্ন দহনের কাব্যিক পথপ্রদর্শক হয়ে থাকুক রবীন্দ্র-সাহিত্যের এই টুকরোখানি।

Advertisements

One Comment Add yours

  1. Arjun Das says:

    ভালবাসা 💜

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s