ও চাঁদ

এমনই বর্ষা ভেজা পথের আভা এসে ঠেকছে রতনপল্লীর সদ্যজাত ভোরের চোখে। কাল তো বৃষ্টি হয়নি এখানে! অদ্ভুত! বাইরেটা এত স্যাঁতস্যাঁতে যেন মনে হবে, এই মিনিট তিনেক আগে হুড়মুড়িয়ে জলের ঝাঁক এসে ভিজিয়ে দিয়েছে নখ-ভুরু। বসন্তের ভোর সচরাচর এমনি হয় না এখানে। দোলের আগের রাতে হালকা চাদর লাগলেও, ফুটিফাটা গরমের মধ্যেই চলে  একে-অপরের গালে ছুঁয়ে দেওয়া আবির পরশ। এখানে আবির খেলাই প্রধান। দূষণ সর্বস্ব জল রঙ যে নেই এক্কেবারে তা নয়, তবে ব্যবহার  অতি উৎসাহিদের মধ্যেই বেশি। রঙের এই চুড়ান্ত সফল উৎসবের রাতে, এখানে, পুব আকাশে গোল চাঁদ ওঠে। মাঝ সন্ধে হলে কোপাই তার বুকের পশমে রাখে চাঁদের আলো। সে আলো অদৃশ্য আবির নিয়ে চলে বয়ে। সে আবির লাগে কখনও তুঙ্গভদ্রা বা কখনও মিসিসিপির বুকে।

আবিরের ক্লান্তিতে খুব ঘুম হয়, বাবা বলেছিল।  কোপাই-পাড়ে খড়ের ছাউনি দেওয়া চপের দোকানে যে বাচ্চাটি চপ বিক্রি করছে, তার চোখেও সেই ক্লান্তি। দূরে বাউল গাইছে, তার গান বয়ে আনছে সোনাঝুরি বনের একাকিত্ব, খোয়াই-এর খাদ। সাঁওতাল গ্রামের ঘরে-ঘরে এতক্ষণে আলো জ্বলে গিয়েছে। যেমনটা জ্বলেছে, কলকাতা থেকে দূরে কোন মফঃস্বলে। চিলকোঠায় আলগোছে ঘুমিয়ে পড়া মেয়েটির ডাক পড়ে এমনই সময়ে। সারাদিন দোল না খেলে সে শ্রান্ত। তার আটপৌরে বেণীর সোহাগ নিয়ে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ, কোপাই-এর তীরে।

ক্লাস ৩ থেকে প্রতিবার দোলে এখানে আসি আমি। কোনবার বাদ যায়নি। প্রতিবার দোলের চাঁদ দেখি। তবে, আবির খেলা আমার ভালো লাগত না, এখনও না। আমার শুধু চাঁদ ভালোলাগে। মেঘ-আবিরে মাখামাখি চাঁদ। জল-হাওয়ায় মাখামাখি চাঁদ।  পিচকারিতে রঙ ভরে, বন্ধুদের নাকে-মুখে-চোখে ছিটিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে মজা ছিল তার সাবস্টিটিউট হয়ে উঠতে পারেনি আবিরের আনন্দ, এমনটা নয়। দোল-পূর্ণিমার সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি এদের দুজনের কেউই। হোলি আর দোলের মাঝের এই উৎকট তফাতটা চোখে পড়লেও, পুর্ণ-চাঁদের এই দেউলিয়া করে দেওয়া প্রেম, হয়ত এরিয়ে গেছে অনেকেই।

কলকাতার চাঁদের সাথে মফঃস্বলের চাঁদের অনেক তফাত। তবুও আমি আজও দোলে কলকাতাকে মিস করি। কলকাতা খুব করে এই আবিরের কালচার অ্যাডপ্ট করে নিলেও, চাঁদের অন্তরঙ্গতাকে আপন করতে পারেনি। হাজারও সাতমহলার ভিড়ে, কলকতার চাঁদের কোন বন্ধু নেই বা মফঃস্বলের চাঁদের মত,আমারও কোন বন্ধু নেই। এমন বন্ধু পেলেও,আমি প্রতি দোলে কলকাতাকে খুব মিস করি। আবিরের এই চির-উন্মাদনা আমাকে কোনদিন ভুলিয়ে রাখতে পারেনি। চাঁদের বন্ধুতাও যে একদম পারেনি, সেটা বললে মিথ্যে বলা হবে, কিছুটা অবশ্যই পেরেছে। তবুও কলকাতাকে এমন দিনে আমি মিস করি কারণ বন্ধুদের সাথে হয়ে না ওঠা হালকা নেশা বা  না খেলা সীমাহীন হোলি নয়, আজীবন দোলে এখানে আসি বলে, চিলেকোঠায় ঘুমিয়ে পড়া, বেণীবাঁধা মেয়েটি তার রঙ-মাখা হাত   ছুঁয়ে  দেয়নি আমায় কখনও।

** শান্তিনিকেতন থেকে

ছবিঃ শৈলী দি। এই ছবিটা না থাকলে, এই লেখাটা তৈরীই হতো না।

Advertisements

5 Comments Add yours

  1. তোমার লেখা পড়ার পরে নিজে একলাইন কিছু লিখতেও ভয় লাগে গুরু…👌 ‘এতো অসম্ভব সুন্দর লিখ কিভাবে?’ এই প্রশ্নটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচে’ বড় অযৌক্তিক প্রশ্ন মনেহয়…তবুও আজকে করছি…এত্তো জোশ লিখ কিভাবে!!😍😍

    Liked by 1 person

    1. kothokkhyapa says:

      Dhonyobaaad Didi

      Liked by 1 person

  2. Chandrayee Chowdhury says:

    অসাধারণ… এর চেয়ে বেশী ঐর কিই বা বলতে পারি…. 😊😊😊😊😊😊😊

    Liked by 1 person

  3. ঋষা ভট্টাচার্য্য says:

    মন ভরে গেলো

    Liked by 1 person

  4. Arjun Das says:

    💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜
    দে ভেঙে

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s