“চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির”

কাঁদতে কাঁদতে নিজের ছোট্ট সন্তানসম্ভবা বেড়ালটাকে জড়িয়ে ধরেছে কলকাতার ছেলেটা। সারা ঘরে লাফাচ্ছে, শূন্যে হাত ছুঁড়ছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ভগবানকে বার দুয়েক ধন্যবাদ জানাচ্ছে। মা বলল, “এবার তো শুয়ে পড়!” কিন্তু মা’কে কে বোঝায় যে আজকের রাত ঘুম আসার রাত নয়। ফেসবুক হোয়াটস-অ্যাপ উত্তাল স্ট্যাটাসে-মেসেজে। ছেলেটা নিজেকে ধরে রাখতে পারছেনা। চিৎকার করে বলছে, “ইয়েস ইয়েস, উই ডিড ইট”। তাকে কেউ দেশদ্রোহী বলেনি বটে কিন্তু তার বাবা রেগে গিয়ে বললে, “টিভি’টা বন্ধ করে শুতে যাও”। শেষমেশ বাবার ধমক খেয়ে নিজের ঘরে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ছেলেটা। ক্লান্ত শরীরে তখন অ্যাড্রিনালিন দৌড়চ্ছে বুলেট ট্রেনের গতিতে। বালিশে মাথা দিয়ে ছেলেটা জাস্ট… জাস্ট ছটফট করতে করতে কেঁদে ফেলল। চোখ মুছে, চোখ বুজতে গিয়ে ভেসে উঠছে একটা মুখ। বয়ঃসন্ধির সময়ে এরম চূড়ান্ত এক্সট্যাটিক মুহূর্ত আর আসেনি তার জীবনে। পারল না ছেলেটা। বালিশের ওপর মুখ গুঁজে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল। আলো জ্বালাল, ফোন খুলল। গেম খেলার ব্যর্থ চেষ্টায় মিনিট বিশেক নষ্ট হলেও কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারলনা ছেলেটা। শেষে কাঁদতে কাঁদতে তার চোখে ঘুম এলো, সন্তানপ্রসবের পর প্রতিটি মায়ের ঠিক যেমন ঘুম হয়, তেমন। ঠিক সেই সময়ে ছেলেটার ছোট্ট ঘরের ঘুলঘুলি চিরে ঢুকছে মিঠে রোদ, এসে পড়ছে ঘরের পশ্চিম দেয়ালে রাখা একটা পোস্টারে, যেখানে ভোরের ভীষণ পবিত্র আলোতে জ্বলজ্বল করছে পোস্টার। ভোরের আলতো আলোয় শুধু বোঝা যাচ্ছে পোস্টারে থাকা একটা জার্সি নম্বর। সাত।

খোঁড়াতে খোঁড়াতে সাইডলাইনের ধারে এসে বারবার চিৎকার করছে লোকটা। হাঁটতে পারছেনা, সহ খেলোয়াড়রা বসতে বলছে, তাদের দাবড়ি দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছেন। ছুটে গেলেন ম্যাচ অফিশিয়ালের কাছে, “আর কতক্ষণ?” ম্যাচ অফিশিয়াল উত্তর দিলেন না। চিন্তায় কপালে ভাঁজ। দাঁতে নখ কাটার অভ্যেস নেই, নাহলে টেনশনে হয়ত পায়ের নখগুলিও খেয়ে নিতেন। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই, আধা-খুঁড়িয়ে, আধা-দৌড়ে গেলেন সহ খেলোয়াড়দের দিকে। তার দল যে জিতেছে। সবার শেষে মেডেল নিতে যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে সে ভীষণ কষ্ট সয়ে, মনে হচ্ছিল হোমারের তৈরি সেই বীর অ্যাকিলিসের গোড়ালিতে যেন একটা তীর এসে ঠেকেছে। উত্তেজনায় ১৯ বছরের একটা ছেলে তখন লাফাচ্ছে, কখন ছুঁয়ে দেখবে ট্রফিটা। আর মধ্যবয়স্ক লোকটার মনে পড়ে যাচ্ছে তার ফেলে আসা সময় আর ড্রিবল গুলোকে। ম্যাচের শুরুতেই প্রচণ্ড আঘাতে চোখের জলে যখন মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, হয়ত বুক ফেটে যাচ্ছিল। পিঠে দেশের পতাকা নিয়ে লোকটা এখুনি ট্রফিটা তুলবে। ১২ বছর আগের সেই রাত মনে পড়ছে একত্রিশ বছরের তারকার। সেবার পারেননি, অতল ফ্রাস্ট্রেশন নিয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছিল এই পোর্তুগিজ বণিককে। এবার শাপমোচন। প্রেসিডেন্ট এগিয়ে আসছেন ভারী ট্রফিটা নিয়ে, ঝাপসা হয়ে আসছে তার চোখ, নিজেকে সামলে নিয়ে দুহাতে তুলে নিলেন ট্রফি, তুলে ধরলেন মেঘে ঢাকা ধ্রুবতারাটির দিকে। জীবনের সবথেকে বড় চিৎকার করতে করতে বারবার ট্রফিটাকে যখন চুমু খাচ্ছিলেন তিনি, তখন উল্টোদিকে পর্তুগিজ গ্যালারীতে দেদার ফরাসী চুমু বিতরণ করছে প্রেমিক-প্রেমিকারা। প্রেসেন্টেশন স্যেরিমনির শেষে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ঠিক আগে আকাশের দিকে তাকালেন তারকা। মনে হল তারারা একটা অদ্ভুত এবং অ্যাবস্ট্র্যাক্ট প্যাটার্ন সাজিয়েছে সারা আকাশজুড়ে। যার আকৃতিটা একটা বিশেষ সংখ্যার মত। সাত।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো – ইউরো ফাইনালের শেষ ৩০ মিনিট বোধহয় একাই খেলে দিলেন। শারীরিকভাবে হয়ত নয়, কিন্তু ভীষণরকম মানসিক ভাবে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, রক্ত ঝরিয়ে ঝরিয়ে। নাহ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো হিরোয়িক নন, একদম নন, বরং তিনি মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখানো কতিপয় শিক্ষকদের মধ্যে একজন।   নাহ্‌, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কখনই হিরোয়িক নন, তিনি বড্ড বেশি রাবীন্দ্রিক। বড্ড বেশি।

Advertisements

One Comment Add yours

  1. Anirban Ghosh says:

    দারুন❤❤❤❤

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s