গুরুজান

প্রেসিডেন্সীর বাইরে দাঁড়িয়ে কোন এক ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের সঞ্চারী হয়ত অপেক্ষা করছে ম্যাথস ডিপার্টমেন্ট ছুটি হবার। সৌম্য পড়ে অঙ্ক নিয়ে। সৌম্য অঙ্ক ভালোবাসে, আর সঞ্চারী সৌম্যকে। ঝগড়া হয়েছে। নতুন কিছু নয়, তবে এবারেরটা অন্যরকম এবং দীর্ঘমেয়াদী। আসলে দুজন একদম আলাদা দুজনের থেকে। একজন ঝালমুড়ি তো অন্যজন তুবড়ি। কিন্তু ওই কথায় আছে না, অপজিট আট্র্যাক্টস। ওদের ক্ষেত্রেও তাই। সারা বছর ঝগড়া মারামারির পরও এরা টিকে আছে – চিপকে আছে একে অপরের সাথে। এ পৃথিবীর সমস্ত বিষয়েই দুজন অদ্ভুতভাবে দুটো ভিন্ন মতে অবস্থান করলেও, ওই একটা যায়গায় দুজনে এক। তামাম দুনিয়া ইভাপোরেট করে গেলেও, ওই একটিমাত্র বিষয় থেকে কেউ ওদের আলদা করতে পারবে না। কোনদিন পারেনি।

পক্স হয়েছে কৌস্তভের। সারা গায়ে গুটিগুটি। বাইরে বেরনো বন্ধ। বইপড়ার অভ্যেস নেই। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে কার্টুনেরাও কেমন ক্লিশে হয়ে গেছে। খবরের চ্যানেলে খবর নয়, বিজ্ঞাপন বেশি। বাঙলা সিরিয়াল এই সময়ে তার স্বাস্থ্যের পক্ষে আরও ক্ষতিকর হতে পারে। মাথা ঘুরছে, বিছানা ছেড়ে উঠে কম্পিউটারের গেম খেলবার প্রশ্নই উঠছে না। দুপুর বারোটা থেকে রাত ৯ টা অব্দি তার বেডরুম জুড়ে থাকে বোরডম আর কড়া আলোপ্যাথির ক্লান্তি। আগামীকালও এমনি পালহীনা নৌকার মত কেটে যাবে, এই ভেবে তার ঘুম আসতেই চায় না। কিন্তু আগামীকালটা যে অন্যরকম। টিভি খুলতেই তার ভালো লাগতে শুরু করল সবকিছু। অসুখের বিলাপ, গতিহীনতার ক্লেদ সবকিছু এক লহমায় আনপ্রেডিক্টেবল নদীর মত হঠাৎ বাঁক নিল। হঠাৎ।

মেডিক্যাল কলেজে পড়ে হয়ত কোন ত্রিদেব, সবে সবে তার জীবনের প্রথম অপারেশনটা অ্যাসিষ্ট করে উঠেছে সে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। রিং বেজে চলেছে অঝোরে। ফোনে বারবার ভেসে উঠছে প্রেমিকার মুখ। ত্রিদেব ফোনটা কেটে দিল। আবার বাজল। আবার কেটে দিল। উঠে এল জানলায়। পর্দা সরাতেই একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া এল ঘরে। হাওয়ারা এসে ঠেকছে মুখে। জানলা থেকে সরে এল ত্রিদেব। চোখে মুখে জল দিয়ে আবার দাঁড়াল জানলায়। বুক ভরে শ্বাস নিতে চাইছে কিন্তু পারছেনা। বারবার মনে হচ্ছে যেন একটা মাংসপিন্ড আটকে আছে বুকের মাঝে। আকাশের দিকে মুখ তুলে একবার চাইল ত্রিদেব। যে ছেলেটা জীবনে কোনদিন কাঁদে নি, সে কাঁদছে। তার দু গাল বেয়ে সরু জলের ধারা নেমে আসছে। আকাশের দিকে চোখ রেখে অবিরাম কেঁদে চলছে। রিং বাজছে। ফোনে ফের ফুটে উঠছে প্রেমিকা। বারবার ওই অপারেশন টেবিলে ক্লোরফর্মে নিথর মেয়েটির ছবি ভেসে উঠছে ওঁর চোখে, ঠিক যেমন অপারেশন টেবিলে মেয়েটির দুটি ওভারি বাদ দেবার সময়েও তার চোখে ভেসে উঠেছিল স্বর্নালীর মুখ। স্বর্নালী ত্রিদেবের প্রেমিকা। কষ্ট হচ্ছে। আর না পেরে ল্যাপিটা খুলল সে। ভেসে উঠল ওয়ালপেপার। এক পলকে সমস্ত মন খারাপ হারিয়ে গেল কোন প্রায়ভঙ্গুর ব্ল্যাকহোলে।

বাঙলা ছবি ডিরেক্ট করবার খুব ইচ্ছে শৈলীর। সেদিন বলছিল, “একটা দৃশ্য শ্যুট করব বুঝলি। একদম ফাঁকা রাস্তা। অনেকটা সোজা গিয়ে রাস্তাটা বাঁক নিচ্ছে অজানায়। একপাশে সবুজ জঙ্গল। আরেক পাশ নিয়ে ভাবিনি এখনও। অনেকটা দূরে দেখা যাচ্ছে কাশ বন। শান্ত বাতাস বইছে – পুজোর বাতাস। ওই রাস্তায় ক্যামেরাটা ফেলে রাখব মিনিট দেড়েক, শুধু দেখা যাবে গাছের পাতা নড়ছে, হাওয়া বইছে। কালারে করব কিন্তু। পা ফেলার খসখস শব্দ হবে। তারপর ক্যামেরার চৌহদ্দি দিকে পেছন ফিরে, ক্যামেরার পাশ থেকে সোজা রাস্তা ধরে হেঁটে যাবে এক জোড়া পা। পরনে ধুতি। ভীষণ স্টেডি হাঁটা। স্ক্রিনে দেখে মনে হবে, রাস্তা দিয়ে কোন এক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক হেঁটে যাচ্ছে – ব্যতিক্রমী বাঙালির মত যার মেরুদণ্ড, সোজা। লোকটা দূরে চলে যাচ্ছে, তার দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। পায়ের খসখস আওয়াজ মিলিয়ে গিয়েছে বলা যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে ঠিক তখন বাজবে সুচিত্রা মিত্রের উদাত্ত কণ্ঠে, তানপুরা সহযোগে “লিখন তোমার ধুলায় হয়েছে ধূলি, / হারিয়ে গিয়েছে তোমার আখরগুলি॥ ”
গান চলতে থাকবে লোকটা আরও ছোট হতে হতে ওই বাঁকের দিকে একটা টার্ন নেবে – স্ক্রিনটা কালো হয়ে যাবে। গানটা কিন্তু তখনও চলছে। তারপর টাইটেল কার্ড। কেমন ?” আমি বললাম কাস্ট কাকে করবি ? শৈলী খুব বাচ্চাদের মত খিলখিল করে হেসেছিল।

সৌম্য-সঞ্চারীর মধ্যে মিলে যাওয়া একমাত্র বিষয়, কৌস্তভের অসুখে পাওয়া দেদার আরামের কারণ, ত্রিদেবের মনভালো করে দেওয়া ওয়ালপেপার এবং শৈলীর ইচ্ছে-ছবির দুরন্ত স্ক্রিন-প্লে ফুটিয়ে তোলার পেছনে একটা লোক, শুধুমাত্র একটা লোক প্রবলভাবে এবং অদ্ভুতভাবে রয়েছে। দুই দশকের সেরা, এবং হাজার হাজার স্ক্রিনপার্সোনার বিজনেস একা খেয়ে নেবার ক্ষমতা রাখা একটা লোক। অদ্ভুত সাবলীল অথচ নরম পেস্ট্রির মত গলে যাওয়া চাহনি, মহাজগতিক ম্যানারিজমে হাঁটা, দার্জিলিং-এর মত ক্যাপটিভেটিং হাসি অমর করে রেখেছে যাকে, সেই চূড়ান্ত ফ্যান্টাসম্যাগোরিয়া-য় ভরপুর ক্যারেক্টার, এদের সবার সাথে – সব্বার সাথে অবলীলায় মিলেমিশে গেছে। লিখতে লিখতে একটা অবিশ্বাস্য রকম ইউফোরিয়া কাজ করছে, মনে হচ্ছে একটা লোক, ভারতের অন্দরে জমে থাকা জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবকিছুকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, বর্তমান ভারতবর্ষের তামাম জনগণের ফ্যান্টাসিয়াকে লিড করছে, একা… আই রিপিট একা। ৫১ বছর বয়সে, দুহাত ছড়িয়ে। লোকটাকে আমি গুরু বলে চিনি, সবাই বলে শাহ্‌ রুখ খান।

গুরুজান, জন্মদিনের একফানুস শুভেচ্ছা পাঠিয়ে দিলাম।

রচনাকাল ঃ ২রা নভেম্বর, ২০১৬

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s